নজরুল কি আমাদের জাতীয় চেতনার কবি?

0
176

এইচ. এম. মেহেদী হাসান: আমার সন্দেহ হয়; নজরুলকে দেখে নয়, জাতিকে দেখে, জাতির অভিভাবক রাষ্ট্রকে দেখে। জন্মদিন অথবা মৃত্যুদিন- এই দুটি দিনে নজরুলকে নিয়ে যে মাতামাতি গণমাধ্যমের কল্যাণে দেখতে পাই, তা কতোটা মৌলিক সেটা নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগে।

একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তার কাজ এবং দর্শন জানা খুব জরুরি। যদি প্রশ্ন করা হয়, নজরুলের সাহিত্য, গান তথা যাবতীয় ‍সৃষ্টি কিংবা তাঁর জীবন-দর্শন সম্পর্কে আমরা কয়জন জানি, তখন হয়তো হাতেগোনা দুয়েক জনকে পাওয়া যাবে। যদি তাই হয়, তবে নজরুল জাতীয় চেতনার-কবি কিভাবে হয়?

জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকই যদি নজরুলকে চিনতে না পারলো, জানতে না পারলো, তাহলে তাঁকে জাতীয়-কবি আখ্যা দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে তথা তাঁকে নিয়েও তামাশা করা হয়। কাউকে নজরুলের কবিতার কথা জিজ্ঞেস করলেই তিনি বলবেন নজরুলের একটিমাত্র কবিতার কথা, আর তা হলো ‘বিদ্রোহী’। হয়তো তিনি শুধু নামটাই জানেন, ভিতরে পড়েও দেখেননি, কিংবা ঐ একটি কবিতাও পুরোপুরি পড়েছেনই বা কয়জন?

নজরুল ঐ-যে একটি কবিতা লিখে ‘বিদ্রোহী কবি’ হলেন, এরপর আরও অসংখ্য প্রেমের, সাম্যের, মানবতার কবিতা লিখেও আর সেই খেতাব থেকে মুক্তি পেলেন না। কেন পাবে বলুন, সবাই তো জানে নজরুল একটিমাত্র কবিতাই লিখেছেন, আর তা হলো ‘বিদ্রোহী’।

নজরুল নিজেই তাঁর সব সৃষ্টির চেয়ে গানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। উনি ১৯৩৮ সালে কলকাতায় জনসাহিত্য সংসদের উদ্বোধন-অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন: “কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি। আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সংগীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনো আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন। এ বিশ্বাস আমার আছে। সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে এটুকু মনে আছে, সংগীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।”

অর্থাৎ বুঝা গেল, নজরুলকে জানতে-বুঝতে হলে তাঁর গানকে প্রাধান্য দিতে হবে। কিন্তু তাঁর ঐ দুটি-একটি গান ছাড়া কয়টি গানই আমরা জানি; বুঝা তো আরও পরের কথা। রবি ঠাকুরের গানের সংখ্যা ২২০০ কিছু বেশি; নজরুলের গানের সংখ্যা সেখানে তিন হাজারেরও অধিক। কিন্তু হায়, এতো গান লিখলেন জীবনভরে, যেই গানকে তাঁর অন্য সব সৃষ্টি থেকে প্রাধান্য দিয়েছেন সেই গানের খোঁজ-খবর আমরা কয়জন রাখি!

ঈদের চাঁদ দেখা গেলে ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি বেজে ওঠে, এ গান ছাড়া বোধহয় ঈদই হয় না। কিন্তু এ গান-যে নজরুলের, তাও অনেকে জানে না; বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করতে পারেন কাউকে। এমনও লোক আছে যারা দীর্ঘদিন ধরে ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী’ গানটিও শুনেছেন সুন্দর একটি রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে! নজরুলের জন্য এরচেয়ে নেমেসিস আর কী হতে পারে?

বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের জগতে নজরুল-যে এক বিস্ময়কর প্রতিভা সে বিষয়ে আমাদের গাল-গপ্পোর জুড়ি নেই। কিন্তু কী লিখেছেন নজরুল, তাঁর কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধে কী আছে তা দেখবার প্রয়োজন বোধকরেছি কয়জন? মেহের নেগার গল্প নিয়ে ছবি হয়, সে ছবি দেখে আমরা মৌসুমী ও ইরিনের নৃত্য দেখে মুগ্ধ হই, কিন্তু নজরুলের লিখা মেহেরনেগারকে কি পাই? আমাদের মহাপণ্ডিত চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে সংলাপ ও দৃশ্যায়ন করে নজরুলকে আমাদের সামনে পরিচিত করে দেন, আর আমরাও বসে বসে সেসব গলাধঃকরণ করি।

বাংলা ছাত্র হওয়ার পরও সিলেবাসে এখন পর্যন্ত নজরুলকে নিয়ে পেলাম না ১০০ নম্বরের একটি পূর্ণাঙ্গ কোর্স। এতে কী প্রমাণ করে? নজরুলের সাহিত্য এতোই যৎসামান্য যে তা নিয়ে ১০০ নম্বরের কোর্স চালু করা ভারি অন্যায় হয়ে যায়।

জীবনভর যিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখে গেলেন, জীবনে প্রয়োগ করে গেলেন, তার সেসব লেখনী, জীবনী না পড়িয়ে শুধু ঐ-যে একখানি কবিতা ‘বিদ্রোহী’ পড়িয়ে আমাদের আবার অসাম্প্রদায়িক হওয়ার বড়বড় বুলি। অসংখ্য হিন্দু পুরাণ আশ্রয় করে গান রচনা করলেও অল্পকিছু ইসলামি পুরাণ যেমন, মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই- গানটি লিখে নজরুল হয়ে গেলেন পাক্কা মুসলমান। আর তাঁর সেই অসিওত পালন করতে তাঁকে কবর দেওয়া হলো ঢাবির মসজিদের পাশে। আমি জানি না, নজরুল ঢাবির ক্যাম্পাসেই তাঁকে মাটি দিতে বলেছিলেন কিনা। তবে তাঁর কবর যেখানে হয়েছে সেখানে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু যখন বলা হয়, তাঁর গানের কথাকেই অনুসরণ করা হয়েছে, তখনই জায়গার প্রসঙ্গটিও আসে।

যাক সেকথা। নজরুলকে আমরা বোধহয় এখনও চিনতে পারিনি, চেনার অনেক বাকি আছে এবং বেশ বাকি আছে। না-জানাদের মধ্যে আমিও একজন। তাই নজরুলকে নিয়ে যখন দেখলাম কিছুই জানি না, কেবল যে-যা বলেছে তার উপর বিশ্বাস রেখেছি; তখন থেকেই শুরু করি নজরুল-অধ্যয়ন। আমার সে অধ্যয়ন এখনও চলছে। অধ্যয়ন পূর্ণতা পেলে নজরুলকে নিয়ে লিখবো, বলবো আরও বিশদভাবে। বিশেষ দিন আজ, তাই নেহাত কিছু লিখলাম। নজরুলের জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here